
লিখেছেন: আমিনুর রহমান জিলু
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা ভেনিজুয়েলায় হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী ফার্স্ট লেডি সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে গেছে এবং তাদেরকে আমেরিকান বিচারের মুখোমুখি করা হবে বলে ঘোষণা এসেছে ওয়াশিংটন থেকে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এই ঘটনা শুধু বিস্ময়কর নয়, বরং গভীরভাবে উদ্বেগজনক। দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে আইনের শাসন ও গণতন্ত্রের রক্ষক হিসেবে তুলে ধরে। কিন্তু একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধানকে সস্ত্রীক, সশস্ত্র বাহিনী পাঠিয়ে তুলে নেওয়ার ঘটনা সেই নৈতিক অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এটি কেবল শক্তি প্রদর্শন নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও মানবাধিকারের সরাসরি লঙ্ঘন। আন্তর্জাতিক আইনে বিষয়টি স্পষ্ট। জাতিসংঘ সনদের ২(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে বলপ্রয়োগ করতে পারে না এবং তাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্র এই সনদের অন্যতম স্বাক্ষরকারী। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, কোন আইনের ভিত্তিতে তারা এই কাজ করল? যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান ও অভ্যন্তরীণ আইন মূলত তাদের নিজস্ব নাগরিক বা তাদের বিচারাধীন ব্যক্তিদের জন্য প্রযোজ্য। সেখানে কোথাও অন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধানকে জোরপূর্বক তুলে আনার অনুমতি নেই। বরং মার্কিন আদালতগুলোও বহুবার স্বীকার করেছে যে বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানদের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক সুরক্ষা মানা বাধ্যতামূলক। সাধারণত যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের পদক্ষেপকে বৈধতা দিতে জাতীয় নিরাপত্তা, সন্ত্রাস দমন বা ড্রাগ ট্রাফিকিং -এর মতো যুক্তি হাজির করে। কিন্তু অভিযোগ থাকলেই কি বিচার ছাড়াই অপহরণ বৈধ হয়ে যায়? যদি তাই হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক আইন আর জঙ্গলের আইনের মধ্যে পার্থক্য কোথায়? এই ঘটনার সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো এর দৃষ্টান্ত। আজ ভেনিজুয়েলা, কাল অন্য কোনো দুর্বল রাষ্ট্র। শক্তিশালী দেশ যদি ইচ্ছামতো দুর্বল রাষ্ট্রের নেতাকে তুলে নিতে পারে, তাহলে জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক আদালত কিংবা কূটনৈতিক সুরক্ষা কেবল কাগুজে কাঠামোতেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
এই প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে। যুক্তরাষ্ট্র কি কখনো চীন, ভারত, পাকিস্তান বা দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানকে এভাবে তুলে নিতে পারবে? উত্তর এক কথায়—না। কারণ এসব দেশ সামরিকভাবে শক্তিশালী, কেউ পারমাণবিক শক্তিধর, কেউ আবার যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত মিত্র। সেখানে শক্তির ভারসাম্য আছে, তাই আইন প্রয়োগের সাহসও সীমিত।
এখানেই আন্তর্জাতিক রাজনীতির নির্মম বাস্তবতা স্পষ্ট হয়। পৃথিবীতে আইন আছে, চুক্তি আছে, প্রতিষ্ঠান আছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যাদের হাতে শক্তি, তারাই অনেক সময় নিয়ম নির্ধারণ করে। ভেনিজুয়েলার ঘটনা দেখিয়ে দেয়—যেখানে শক্তির ভারসাম্য নেই, সেখানে আইন দুর্বল হয়ে পড়ে।
এই বাস্তবতা আমাদের জন্যও চিন্তার। পাকিস্তানের মতো একটি দেশ, যার অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে সংকটে, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দারিদ্র্যে জর্জরিত, তারাও কিন্তু পারমাণবিক শক্তির অধিকারী। অন্যদিকে বাংলাদেশ অর্থনীতি, রপ্তানি, মানবসম্পদ ও সামাজিক উন্নয়নে অনেক ক্ষেত্রেই পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে।
তাহলে প্রশ্ন ওঠে—আমরা কেন পারব না? পারব না বলার পেছনে যুক্তির চেয়ে ভয় বেশি। আন্তর্জাতিক চাপের ভয়, নিষেধাজ্ঞার ভয়, বড় শক্তির অসন্তুষ্টির ভয়। কিন্তু ইতিহাস বলে, কোনো রাষ্ট্র কেবল ভালো আচরণের ওপর ভর করে টিকে থাকে না। টিকে থাকতে হলে নিজের নিরাপত্তা নিজেকেই নিশ্চিত করতে হয়। এখানে পরিষ্কার থাকা জরুরি। সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি মানেই যুদ্ধপ্রবণতা নয়। পারমাণবিক সক্ষমতা মানেই আগ্রাসন নয়। এটি মূলত প্রতিরোধমূলক শক্তি—যা অন্যকে আগ্রাসনের আগে ভাবতে বাধ্য করে। ভেনিজুয়েলার ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, যাদের সেই প্রতিরোধ ক্ষমতা নেই, তাদের সার্বভৌমত্বও নিরাপদ নয়।
বাংলাদেশ যদি আজ এসব বিষয় নিয়ে বাস্তবতা দিয়ে ভাবতে না শুরু করে, তাহলে ভবিষ্যতে এর মূল্য দিতে হতে পারে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি চিরস্থায়ী বন্ধুত্বে চলে না। স্বার্থ বদলায়, মিত্র বদলায়, শক্তির সমীকরণ বদলায়। ভেনিজুয়েলা আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। আবেগ দিয়ে নয়, বাস্তবতা দিয়ে ভাবার সময় এখনই। শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হলে কৌশলগত চিন্তা, দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা পরিকল্পনা এবং আত্মরক্ষার সক্ষমতা প্রয়োজন। নইলে একদিন আমাদেরও একই প্রশ্নের মুখে পড়তে হতে পারে—আমাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করবে কে?
এই প্রশ্নের উত্তর আগে থেকেই প্রস্তুত না থাকলে, তখন আফসোস করার সুযোগও থাকবে না।
লেখক: আমিনুর রহমান জিলু
সাংবাদিক ও কলাম লেখক
তারিখ: ৪ জানুয়ারি ২০২৬ ইং
আপনার মতামত লিখুন :